বিভিন্ন ধাতুর উত্স, ধর্ম এবং ব্যবহার 2

বিভিন্ন ধাতুর উত্স, ধর্ম এবং ব্যবহার

Advertisements

বিভিন্ন ধাতুর উত্স ও ব্যবহার

অ্যালুমিনিয়াম

অ্যালুমিনিয়াম বোরন শ্রেণীর একটি রাসায়নিক মৌল।

  • বোরন শ্রেণীঃ পর্যায় সারণীর ১৩ তম শ্রেণীর মৌলগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে।
  • পর্যায় সারণীর বোরন (B), অ্যালুমিনিয়াম (Al), গ্যালিয়াম (Ga), ইন্ডিয়াম (In), থ্যালিয়াম (Tl), এবং ইউনুনট্রিয়াম (Uut) ইত্যদি মৌলের সমন্বয়ে এই শ্রেণীটি গঠিত হয়েছে।
  • শ্রেণীঃ আধুনিক পর্যায় সারণীতে রাসায়নিক মৌলসমূহকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে সমধর্মী মৌলসমূহে একই লম্ব-কলামে একটির নিচে আরেকটি স্থান পায় । এর ফলে মৌলসমূহ ১৮টি লম্বা-কলাম এবং ৭টি অনুভূমিক সারিতে বিন্যস্ত হয়। প্রত্যেকটি লম্ব-কলামকে একেকটি শ্রেণী বা chemical series বলা হয়। আধুনিক পর্যায় সারণীতে মোট ১৮ টি শ্রেণী রয়েছে।
  • পর্যায় সারণীঃ বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে একত্রে উপস্থাপনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ছক হল পর্যায় সারণী।
  • অ্যালুমিনিয়াম এর সংকেত Al ও পারমাণবিক সংখ্যা ১৩।
  • অ্যালুমিনিয়াম রূপার মত সাদা রঙের ধাতু এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় জল এ অদ্রবনীয়।
  • অ্যালুমিনিয়াম প্রকৃতিতে বিপুল পরিমাণে পাওয়া যায়।
  • ভূ-ত্বকে প্রাপ্ত মৌলিক পদার্থের মধ্যে অক্সিজেন এবং সিলিকনের পরেই অ্যালুমিনিয়ামের অবস্থান
  • ধাতব পদার্থের মধ্যে প্রথম।
  • ভূ-ত্বকের মোট ওজনের ৮% অ্যালুমিনিয়াম দ্বারা গঠিত।
  • অ্যালুমিনিয়ামের প্রধান আকরিকগুলি হল :- [i] ডায়াস্পোর [ii] বক্সাইট [iii] গিবসাইট [iv] ক্রায়োলাইট
  • অ্যালুমিনিয়ামের সবচেয়ে সহজলভ্য আকরিক হলো বক্সাইট।
  • ভারতে বিহার, ওড়িশা, গুজরাট, কর্ণাটক ও উত্তরপ্রদেশে প্রচুর পরিমাণে বক্সাইট পাওয়া যায় ।
  • অ্যালুমিনিয়াম পাতে মোড়া আচার খাওয়া উচিত নয়— কারণ আচারে ভিনিগার (অ্যাসেটিক অ্যাসিড) থাকে যা অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লবণ উত্পন্ন করে । এই লবণ আচারের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করে শরীরের ক্ষতিসাধন করে  ।

ম্যাগনেসিয়াম

  • ম্যাগনেসিয়ামের সংকেত— Mg
  • উত্স: ম্যাগনেসিয়ামকে প্রকৃতির মধ্যে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় না। এর নানা রকম যৌগ প্রচুর পরিমাণে প্রকৃতিতে পাওয়া যায় ।
  • ম্যাগনেসিয়ামের প্রধান আকরিকগুলি হল :-[i] ম্যাগনেসাইট   [ii] ডলোমাইট  [iii] কার্নালাইট
  • ভারতে তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে ম্যাগনেসাইট আকরিক পাওয়া যায় ।
  • ব্যবহার:-
    • পরীক্ষাগারে বিজারক রূপে এবং জৈব রসায়নে গ্রিগনার্ড বিকারকরূপে ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহৃত হয় ।
    • বোরন এবং সিলিকন নিষ্কাশনে ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহৃত হয় ।
    • ফটোগ্রাফির ফ্ল্যাশ বাল্ব ও সাংকেতিক আলো উত্পাদনে, বাজি ও বোমা প্রস্তুতে ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহৃত হয় ।
    • বিমান এবং মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতিতে ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহৃত হয় । ডুরালুমিন, বিমান এবং মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতিতে ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহৃত হয় ।
    • ম্যাগনেসিয়ামের কয়েকটি যৌগ ওষুধ উত্পাদনে ব্যবহৃত হয় ।
  • ম্যাগনেসিয়াম ধাতুতে আগুন লাগলে CO2 গ্যাসের সাহায্যে সেই আগুন নেভানো যায় না, কারণ জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম CO2 গ্যাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড [MgO] ও কার্বন উত্পন্ন করে

দস্তা বা জিঙ্ক

  • দস্তা বা জিঙ্ক -এর সংকেত— Zn
  • উত্স : দস্তা বা জিঙ্ক ধাতুকে প্রকৃতির মধ্যে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় না ।
  • লোহা, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার পরে দস্তাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ধাতু।
  • জিঙ্কের প্রধান আকরিকগুলি হল:- [i] জিঙ্কাইট [ii] ক্যালামাইন [iii] জিঙ্কব্লেন্ড
  • জিঙ্কব্লেন্ড আকরিক থেকে ধাতব জিঙ্ক নিষ্কাশন করা হয় ।
  • ভারতের রাজস্থান, বিহার, পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুতে জিঙ্কব্লেন্ড পাওয়া যায় ।
  • জিঙ্কব্লেন্ড জিঙ্কের প্রধান আকরিক ।
  • ব্যবহার
    • লৌহ দ্রব্যের উপর জিঙ্কের প্রলেপ দিয়ে (গ্যালভানাইজেশন) মরচে নিবারণ করা হয় ।
    • জিঙ্ক হোয়াইট নামক সাদা রং প্রস্তুতিতে জিঙ্কের ব্যবহার হয় ।
    • রবার শিল্পে সক্রিয়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
    • জিঙ্ক ক্লোরাইড দুর্গন্ধনাশক ও কাঠ সংরক্ষক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
    • ক্যলামাইন লোশনে জিংক হাইড্রক্সিকার্বনেট ব্যবহৃত হয়।
    • পরীক্ষাগারে H2 গ্যাস উত্পাদনে এবং বিজারকরূপে জিঙ্কের ব্যবহার হয় ।
    • বৈদ্যুতিক সেল এবং ড্রাই সেল প্রস্তুতিতে জিঙ্কের ব্যবহার হয় ।
    • সিক্ত পদ্ধতিতে সিলভার এবং গোল্ড ধাতুর নিষ্কাশনে জিঙ্কের ব্যবহার হয় ।
    • ভিটামিন ট্যাবলেটেও জারণরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য দস্তা ব্যবহৃত হয়।
  • দস্তাকে বায়ু বা অক্সিজেনে তীব্র উত্তপ্ত করলে সাদা ধোঁয়ার আকারে উত্পন্ন জিঙ্ক অক্সাইড  ক্রমশ শীতল হয়ে সাদা উলের মতো জমা হয় । একে দার্শনিকের উল (বা জিঙ্ক হোয়াইট)  বলে ।
  • আর্দ্র বায়ুতে দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখলে দস্তার ওপর ক্ষারীয় জিঙ্ক কার্বনেটের  সাদা আস্তরণ পড়ে । ফলে দস্তার ধাতব উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় ।
  • দস্তার পাত্রে কিম্বা দস্তার প্রলেপ দেওয়া পাত্রে খাদ্যদ্রব্য রাখা উচিত নয় । কারণ সেক্ষেত্রে দস্তার সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের বিক্রিয়ায় উত্পন্ন দস্তা ঘটিত লবণ আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে

লোহা বা আয়রন

  • এর সংকেত— Fe
  • আয়রনের প্রধান আকরিকগুলি হল:  [i]  ম্যাগনেটাইট [ii]  রেড হেমাটাইট [iii] আয়রন পাইরাইটিস [iv] সিডারাইট
  • ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশে লোহার আকরিক পাওয়া যায়। ভূ-ত্বকে আয়রনের পরিমাণ 4.12 শতাংশ
  • আয়রন পাইরাইটিসকে লোহার আকরিক বলা হয় না— কারণ  আয়রন পাইরাইটিস থেকে সুলভে ও সহজে আয়রন নিষ্কাশন করা যায় না ।
  • সাধারণ উষ্ণতায় আর্দ্র বায়ুতে লোহাকে রেখে দিলে লোহার ওপর লালচে বাদামি রঙের একটি আস্তরণ পড়ে । এই আস্তরণকে লোহায় মরচে পড়া বলে । মরচে হল জল যুক্ত ফেরিক অক্সাইড যার সংকেত হল Fe2O3, H2
  • লোহায় মিশ্রিত কার্বনের পরিমাণের ওপর লোহার ধর্ম ও প্রকৃতি নির্ভর করে ।
  • আর্দ্র বায়ুতে লোহাকে রেখে দিলে লোহায় মরচে পড়ে কিন্তু স্টেইনলেস স্টিল বা কলঙ্কহীন ইস্পাতে মরচে পড়ে না কেন ?স্টেইনলেস স্টিল  লোহা এবং ক্রোমিয়ামের ধাতু সংকর । ধাতু সংকর জলবায়ুর প্রকোপ থেকে পদার্থের ক্ষয় নিবারণ করে । তাই আর্দ্র বায়ুতে লোহায় মরচে পড়ে ,কিন্তু লোহার সংকর ধাতু স্টেইনলেস স্টিলে মরচে পড়ে না ।
  • গ্যালভানাইজেশন কী লোহার তৈরি বস্তুকে মরচের হাত থেকে রক্ষা করতে ঐ বস্তুগুলির উপর জিঙ্কের পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয় । একে জিঙ্কলেপন বা গ্যালভানাইজেশন বলে ।
  • লৌহ পাত্রে দস্তার প্রলেপ দেওয়ার উদ্দেশ্য কী ?মরচের হাত থেকে রক্ষা করতে লৌহ পাত্রে দস্তার প্রলেপ দেওয়া হয়  ।
  • নিষ্ক্রিয় লোহা কী অতি গাঢ় বা ধুমায়মান নাইট্রিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় লোহার উপর ফেরোসো ফেরিক অক্সাইড  (Fe3O4) -এর আস্তরণ পড়ে । ফলে লোহা আর দ্রবীভূত হয় না । একে নিষ্ক্রিয় লোহা বলে ।

তামা বা কপার

  • এর সংকেত— Cu
  • কপারের প্রধান আকরিকগুলি হল : [i] কপার গ্লানস [ii] কপার পাইরাইটিস বা চ্যালকোপাইরাইটিস [iii] ম্যালাকাইট  [iv] আজুরাইট
  • বৈদ্যুতিক তার হিসাবে তামা এবং রান্নার বাসনপত্র নির্মাণে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়— কারণ,বিদ্যুতের সুপরিবাহী বলে তামাকে বৈদ্যুতিক তার হিসাবে ব্যবহার করা হয় । অ্যালুমিনিয়াম তাপের সুপরিবাহী ও হালকা ধাতু । তাই রান্নার বাসনপত্র নির্মাণে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়
  • তামার মুদ্রাকে দীর্ঘদিন ধরে আর্দ্র বায়ুতে ফেলে রাখলে ওটি সবুজ বর্ণ ধারণ করে কেন ?তামার মুদ্রাকে দীর্ঘদিন ধরে আর্দ্র বায়ুতে ফেলে রাখলে তামার উপর প্রথমে অক্সাইড ও সালফাইডের বাদামি রঙের আস্তরণ পড়ে এবং ঐ আস্তরণ ক্রমে সবুজ রঙের ক্ষারীয় কপার সালফেট -এ পরিণত হয় ফলে তামার মুদ্রাটি সবুজ বর্ণ ধারণ করে ।
সংকর ধাতু [Alloy]
ধাতু-সংকর হল দুই বা ততোধিক ধাতু অথবা ধাতু এবং অধাতুর সাধারণ মিশ্রণ ।
সংকর ধাতুর একটি উপাদান পারদ হলে, তাকে পারদসংকর বা অ্যামালগাম বলে ।
ধাতু-সংকরের নাম এবং উপাদান
ধাতুর নাম উপাদান
পিতল তামা এবং দস্তা
কাঁসা তামা এবং টিন
ব্রোঞ্জ তামা এবং টিন
অ্যালুমিনিয়াম-ব্রোঞ্জ তামা এবং অ্যালুমিনিয়াম
জার্মান সিলভার তামা, দস্তা এবং নিকেল
ডুরালুমিন অ্যালুমিনিয়াম, তামা, ম্যাগনেসিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজ
ম্যাগনেলিয়াম অ্যালুমিনিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম
স্টেইনলেস স্টিল লোহা এবং ক্রোমিয়াম

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 17 =

error:
Scroll to Top